কর্ণফুলি মইজ্জারটেকে টোকেন বিহীন নতুন ফাঁদে সিএনজি চালকরা
চট্টগ্রাম ব্যুরো মাসুদ পারভেজ।
কর্ণফুলি মইজ্জারটেকে টোকেন বিহীন নতুন ফাঁদে সিএনজি চালকরা,
টোকেন বন্ধ,চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি,
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক এলাকায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা সিএনজি অটোরিকশা চালকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। চালকদের দাবি, শিকলবাহা মাষ্টারহাট এলাকার আমজাদ ও চরলক্ষ্যা বোর্ড বাজার এলাকার মো. মামুন'সহ কয়েকজন ব্যক্তি গন্তব্যভেদে গাড়িপ্রতি ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন।
চালকদের অভিযোগ, নির্ধারিত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অপমান, মারধর এবং গাড়ি আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের কথিত সোর্সদের মাধ্যমে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
স্থানীয় সূত্র ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মইজ্জ্যারটেকে আসা কয়েক হাজার সিএনজি অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে টোকেন বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল। চালকদের দাবি, প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসোহারায় নিয়মিত টাকা আদায় করা হতো এবং টোকেনের মাধ্যমে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতো। যার ফলে অন্য কোন চক্র সেখান থেকে আলাদা ভাবে টাকা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই টোকেন বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি চালকদের। কিন্তু এরপরই একই ধরনের অর্থ আদায় নতুন কৌশলে শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ওই চক্রের সদস্য আমজাদ ও মামুনের বিরুদ্ধে।
চালকদের ভাষ্য, এখন দৃশ্যমান টোকেন বন্ধ হলেও। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সরাসরি টাকা দিতে হয়। টাকা দেওয়ার পরই গাড়ি দাঁড় করানো, যাত্রী তোলা কিংবা নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের সুযোগ মেলে।অন্যতায় যাত্রী ওঠানামা পর্যন্ত করতে দেয় না চাঁদাবাজরা, অনেক সময় মারধরেরও শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ।
মো: শফি নামের এক চালক বলেন, আগে টোকেনের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হতো। এখন টোকেন নেই, কিন্তু টাকা নেওয়া বন্ধ হয়নি। শুধু পদ্ধতি বদলেছে। টাকা না দিলে গাড়ি নিয়ে ঝামেলা করা হয়। যাত্রী তুলতে দেয় না মইজ্জ্যারটেক গাড়ি দাড়াইতে দেয় না,কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধরের শিকার হতে হয়,তাই বাধ্য হয়ে বাহির থেকে আসা চালকরা তাদেরকে টাকা দিতে হয়।এখানে আমরা অসহায়।
তিনি আরও বলেন, এসব কিছু পুলিশের লোকজন দেখলেও না দেখার ভান করে থাকে,এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের আগের টিআইয়ের কাছে একাধিক বার অভিযোগ দিলেও পুলিশ তাদেরকে কিছুই করে না উল্টো যারা অভিযোগ দিয়েছে তাদেরকে অপমান অপদস্তের শিকার হতে হয় বলে জানান।
চালকদের অভিযোগ, মইজ্জ্যারটেকে আসা সিএনজি অটোরিকশার গন্তব্য অনুযায়ী চাঁদার হার নির্ধারণ করা হয়। দূরবর্তী উপজেলা থেকে আসা গাড়ির ক্ষেত্রে আদায়ের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাড়িপ্রতি ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এতে সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয় বলেও দাবি তাদের। সে হিসাবে মাসে আদায়ের পরিমাণ গিয়ে দাড়ায় প্রায় ছয় লাখ টাকার মতো।
শাহ আলম নামের স্থানীয় সিএনজি চালক বলেন, একজন সিএনজি চালক সারাদিন গাড়ি চালিয়ে কত টাকা ইনকাম করে? সেখান থেকে গ্যাস সহ সড়কে নানা খরচ মিটিয়ে কোন রকম সংসার চালায়।কিন্তু সেখানে যদি মইজ্জ্যারটেকে এসে কোন কারণ ছাড়াই মানুষকে টাকা দিতে হয় তাহলে চিন্তা করুন আমাদের কি অবস্থা হয়।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে টোকেন ছিল টাকা দিলেও মানা যায়, অন্তত পুরো মাস শান্তিতে গাড়ি চালাতে পারতাম। কিন্তু আমজাদ মামুন'রা কি হিসেবে টাকা নিচ্ছে? কেন তাদের টাকা দিতে হবে? টাকার বিনিময়ে চালকদের কে কিছু দিচ্ছে কি না তাও জানি না তারা এসে শুধু টাকা দাবি করে। যদি না দি তাহলে গাড়ি থেকে যাত্রী নামিয়ে দেয়,না হয় যাত্রী তুলতে দেয়না,গাড়ি পর্যন্ত দাড়ায়তে দেয় না বলে অভিযোগ তার।
কক্সবাজারের পেকুয়া ও বদরখালী থেকে নিয়মিত মইজ্জ্যারটেকে আসা চালকদের অভিযোগ, দূরপথ পাড়ি দিয়ে মইজ্জ্যারটেকে পৌঁছানোর পর তাদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা হয়।পথে জ্বালানি, গাড়ির মেরামত ও অন্যান্য খরচ থাকে। এখানে এসে আবার জোর করে টাকা দিতে হলে আমাদের অবস্থা টা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় আপনারা চিন্তা করুন। টাকা দিতে না চাইলে গাড়ি নিয়ে ঝামেলা করার ভয় দেখানো হয়। যাত্রীদের নামিয়ে দেয়, যাত্রী তুলতে দেয় না ইত্যাদি।
বদরখালীর রহিম নামের এক চালক বলেন, আমরা যাত্রী নিয়ে আসি এবং ফেরার সময় তাদেরকে টাকা বা দিয়ে যাত্রী তুলতে পারবে না,গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে যাত্রীদেরও ভোগান্তি হয়, চালকদেরও আয় কমে যায়।
তার ভাষ্য,প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।
স্থানীয় চালকদের অভিযোগ, আমজাদ ও মামুন একা নন; তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন অসাধু ব্যক্তি অর্থ আদায়ের কাজে যুক্ত রয়েছেন। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা, সিএনজি সমিতির কয়েকজন নেতা এবং প্রশাসনের কথিত কিছু সোর্সের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এ কার্যক্রম চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
তাদের দাবি, আদায় করা অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়ে যায়। তবে কারা এই অর্থের ভাগ পান, কীভাবে টাকা বণ্টন হয় এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যক্তি জড়িত কি না এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যার কারণে সরজমিনে প্রশাসনের নজরদারি খুবই প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
চালকদের অভিযোগ, অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা স্থানীয় রাজনৈতিক নাম সর্বোচ্চ ব্যক্তির নাম ব্যবহার করেন। এতে সাধারণ চালকরা প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
অভিযোগের বিষয়ে শিকলবাহা মাষ্টারহাট এলাকার আমজাদ ও চরলক্ষ্যা বোর্ড বাজার এলাকার মো. মামুনের সাথে একাধিক যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব কামরুদ্দিন সবুজ বলেন,কেউ যদি রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে, তাহলে তার দায় দল নেবে না। অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অবৈধ সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, চালকদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি।
চালকদের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, সড়কে অনেক সময় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতিতেই অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ট্রাফিক পুলিশ সবকিছু দেখেও যেন না দেখার ভান করে। আমরা অভিযোগ করলে উল্টো গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে হয়রানি করা হবে এমন ভয় থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক পুলিশের টিআই শেখ আব্দুল্লাহ'র মুঠোফোনে কয়েকদিনে একাধিকবার কল যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেনি। যার কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মইজ্জ্যারটেক দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতকেন্দ্র। প্রতিদিন পেকুয়া, বদরখালী, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি অটোরিকশা এ এলাকায় চলাচল করে।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে চালকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তা শুধু চালকদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে না, বরং পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বাড়াবে বলে দাবি সড়কে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কারী সদস্যরা।
চালকদের দাবি, প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান ছাড়া এ ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অর্থ আদায়ের সঙ্গে কারা জড়িত, টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যক্তির মদদ রয়েছে কি না তা তদন্ত করে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
চালকদের প্রশ্ন টোকেন বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পরও যদি একই জায়গায় একইভাবে টাকা আদায় চলতে থাকে, তাহলে শুধু পদ্ধতি বদলেছে, নাকি চাঁদাবাজির পুরো ব্যবস্থাই নতুন নিয়ন্ত্রণে গেছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন প্রশাসনিক তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।